loader
  • Home   >
  • এঁটো

এঁটো

eto Image

style

এঁটো

।।১।।

সকাল সাড়ে দশটায় কোনরকমে নাকে মুখে দুটো গুঁজে বাবা চলে গেল।
এই সকালের সময়টায় মায়ের পুরোদমে যুদ্ধ চলে রান্নাঘর আর ডাইনিং রুমে। বাবা চলে যেতে মা
বসে পড়েছে যুদ্ধের সরঞ্জাম গুছিয়ে রান্নাঘরটাকে একটু ভদ্রলোকের মত করতে।
এখন এগারোটা বাজতে পাঁচ। আমি সকালে মাঠ থেকে খেলে ফেরার পথে অমলকাকুর দোকান থেকে
চারটে ডালপুরি খেয়ে ঢুকেছি।
এই কদিনের জন্য বাড়িতে এসে আর ভাত ডাল দিয়ে ব্রেকফাস্ট করতে মুখে রোচে না। আমার
ইঞ্জিনিয়ারিং এ ফাইনাল ইয়ার চলছে। অন ক্যাম্পাসে চাকরি হয়ে গেছে, বি-টেক শেষ হতেই জয়েন
করবো।
দু'দিন পরেই ফিরে যেতে হবে যাদবপুর। আমি মফস্বলের ছেলে সকাল বিকাল একটু খেলাধুলো না
করলে শরীরটা ম্যাজম্যাজ করে। তাই বাড়ি এলেই আমি টোটো কোম্পানি।
এগারোটা বাজল, মা এখন বাবার থালাতে কটা পড়ে থাকা ভাত আর মাছের ভাঙা টুকরো নিয়ে
জলখাবারে বসেছে।
আমি এসব দেখছি ছোটবেলা থেকেই, কোনদিন নোটিস করিনি। বাবা অফিস বেরিয়ে গেলে মা ওই
ভাতের থালা নিয়ে গজগজ করতে করতে খানিক পর ওতেই একটু ডাল ঝোল ঢেলে নিয়ে খেতে বসে
যায়-  সকাল থেকে উঠে আমি চড়কির মতো পাক খেয়ে যাব, আর বাবু ভাত নষ্ট করে চলে যাবে।
যাও যাও, অমলের দোকানে গিয়ে বাসি পোড়া গেল গে যাও।
বাপ-ছেলে সব এক রকম হয়েছে, এদের ভাতের হাঁড়ি ঠেলতে ঠেলতে আমার সারাজীবন কেটে গেল”

।।২।।
– কেন মা? কে মাথার দিব্যি দিয়েছিল?
– এই তুই সর, একদম বাবার মত ঝগড়া করবি না।
– বাবার মত কেন হবে, আমি তো তোমার ছেলে। তোমার মত করছি।
– একদম মাথা গরম করাবি না ঋজু, এত বড় ছেলে বাড়ির একটা কাজ করে না, আবার মুখে মুখে
তর্ক করতে এসেছে।
– আচ্ছা বেশ, তুমি বা বাড়ির চোদ্দো গন্ডা কাজ করে কোন অ্যাওয়ার্ডটা পাচ্ছ?
– এই করতে মুখের রক্ত তুলে তোকে বড় করলাম রে জানোয়ার, খুব লায়েক হয়ে গেছ না?
– ঠিক আছে ,তালে আমি চলে যাই তারপর এসব কান্নাকাটি কোরো। আমার এসব আর ভালো লাগে
না।
– হ্যাঁ সেই তো, এখন তো এসব বলবি, মায়ের তো আর যাওয়ার জায়গা নেই, মা শুধু খেটে মরুক…
বাবা গো, দেখে যাও, বলে গেছিলে না এই ছেলে নাকি আমাকে দেখবে।
– খামোখা দাদুকে টানছো কেন? আমার বাবার মাথা খেয়ে হচ্ছে না!
– বের হ, এক্ষণি বাড়ি থেকে বের হ, বাবা ফিরলে বাবার লেজ ধরে ফিরিস।
– সে না হয় যাচ্ছি, কিন্তু ফ্রীজে বরফ নেই আগেই বলে রাখলাম, গৌরাঙ্গ দার মিষ্টির দোকান
থেকে এনে রাখব? তোমার মাথা রাগের চোটে ব্লাস্ট করলে তার দায় কিন্তু আমার না
– বেরোবি বা ঝাঁটার বারি খাবি!

এরপরেরটুকুর আওয়াজ আস্তে আস্তে কমে আসে, ক্যামেরা ঝাপসা হয়, পেছনে বাজতে থাকে
মিষ্টি একটা সুর।
সিনেমা, না?
সিনেমা না।
পর পর তিনটে মেয়েকে পার করা দাদুর সামান্য চাকরির পক্ষে সম্ভব ছিল না। মা বাড়ির বড় মেয়ে।
কোনমতে মিটিয়ে দিতে পারলে দায়মুক্ত হওয়া যায়।
আমার বাবাদের তখন বড় ঘর, সে যতই বেকার পাত্র হোক না, তখনকার দিনে অমুকের ছেলে-
তমুকের ছেলে হলে বিয়ে থাওয়ায় বেশি বেগ পেতে হত না।
এরকমই শীত-বসন্তের মাঝামাঝি একটা দিনে
তাই বেশ ধূমধাম করেই আমার টিউশন মাস্টার বাবার সাথে উচ্চমাধ্যমিক পাশ মায়ের বিয়ে হয়ে
গেল। মাও অল্প কদিনে শিখে গেল কি করে ফুঁ দিয়ে উনুন ধরাতে হয়, কেমন করে করে
মঙ্গলচণ্ডীর ব্রত।

।।৩।।
দুদিনের মধ্যে আমার আর ফেরা হয়নি যাদবপুর। কয়েকটা কাজে আটকে পড়েছি বাজে ভাবে। সেদিন
আমার সাথে ওই ঝগড়ার পর থেকে মায়ের ভীষণ বমি। মাথা গরম হলে যে বমি হয় এটা কই পড়িনি
তো!- জোকটা ক্র্যাক করতে গিয়েও করলাম না। বরং একটা উৎকন্ঠা হল। দায়িত্ব নেওয়ার
বয়সটা হয়ে গেছে। এতদিনে আমার বয়সে আমার মা সংসার করছে, বাচ্চা সামলাচ্ছে। আর আমি,
আমরা পড়াশোনার দোহাই দিয়ে কদ্দিন দায়িত্ব থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকব!
আমি যদিও সন্ধ্যেবেলা পাড়ার ফার্মেসি থেকে ওষুধ এনে দিয়েছিলাম, ওটা খাওয়ার পর ওটাও
উগরে দিল। বাবা অফিস থেকে ফিরে সেই যে চা খেতে বেরিয়েছে, এখনো ফেরেনি।
রাত নটার সময় দেখছি, মা টুকটুক করে রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছে। রুটি করতে হবে।

আমাদের জেনারেশন দায়িত্ব বলতে সবচেয়ে আগে যেটা বোঝে সেটা হল ধমক। আমিও মাকে ধমক
দিয়ে বললাম, তোমাকে কে বলেছে রান্নাঘরে আসতে! একদিন উপোস থাকলে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে
যায়না। আমি অমল কাকুর দোকান থেকে রুটি তরকা নিয়ে আসছি আমার আর বাবার।
– ফালতু মাথা খাসনা তো, তোর বাবার বাইরের খাওয়া বারণ। এতদিন পারছি যখন, তোকে আর
একদিন এসে আদিখ্যেতা করতে হবে না।
– আদিখ্যেতা না মা, যাও তুমি, আমি করছি রুটি।
প্রসঙ্গত বলি, আমি যে রান্না একদম পারিনা তা না, তবে আজ অব্দি রুটি গোল করতে পারিনি।
রুটির মাঝে মাঝে ফুটো হয়ে যায়, কোন কোনটা আটকে থাকে চাকতির গায়।
– মরার চুল ছিঁড়ে আর মরা হালকা করতে হবে না। বাপকে ফোন করে দেখ আজ বাড়ি ফেরার ইচ্ছে
আছে কিনা।
– কেন পড়ে আছো মা, একটা দায়িত্বজ্ঞানহীন লোকের বউ আর একটা বেয়াদপ ছেলের মা হয়ে
থেকে যাওয়ার এত ইচ্ছে! নিজের নাম সখ আল্লাদ কিচ্ছু নেই?
– কটা পাতা ইংরেজি পড়ে খুব বড় বড় কথা শিখেছিস! দায়িত্বজ্ঞানের তুই কি বুঝিস!
– বুঝি না তো, তুমি বোঝাও। আজ অব্দি কতবার বাবা নিজে থেকে জিজ্ঞেস করেছে তুমি খেয়েছো
কিনা। কই, আমাকে তো রোজ ফোন করে জিজ্ঞেস করতে ভোলে না!
– সে সব যদি তুই বুঝতি, তালে তো তোর পেটে আমাকে জন্মাতে হত।
– কথা ঘুরিও না মা, যাও গিয়ে শুয়ে পড়।

মা আর সত্যিই কথা বাড়ায়নি, নিজের ঘরের দিকে হাঁটা দিল। ঢোকার আগে হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেল।
আমার দিকে পিছন ফিরেই বলল,
রাতে তোর বাবা ফিরলে যখন আমার বদলে তোকে খাবার বাড়তে দেখবে, তখনি জিজ্ঞেস করবে‌
আমার কথা। তুই যা বলার বলবি, তা মাথা নেড়ে বলবে,- ওহ, ওষুধ খেয়েছে?
তুই আবার কিছু একটা বলবি, ও শুধু বলবে – হুম।
তারপর শুতে যাওয়ার সময় এক বাটি জল মুড়ি নিয়ে গিয়ে দাঁড়াবে বিছানার সামনে। বেশি করে চিনি
দেবে তাতে, কতবার বলেছি, আমি এত মিষ্টি খাইনা। কে শোনে কার কথা! আমিও তখন কোন
ঝামেলা না করে খেয়ে নেব পুরোটা।
দায়িত্ব জিনিসটা না দেখনদারির নয়, তাহলে এতদিন সুখী গৃহকোণ হত, শান্তির সংসার হত না।

।।৪।।
সকাল সাড়ে দশটায় কোনরকমে নাকে মুখে দু'টো গুঁজে বাবা চলে গেল। মানুষটার যে সারাজীবন
কিসের এত তাড়া কে জানে!
আমি আর মা সবে মাত্র ফিরেছি। ক'দিন ধরে খুব ধকল গেছে। আজ মাকে দেখে অবাক হচ্ছি, বাবার
ফেলে যাওয়া খাবার নিয়ে চিৎকার করছে না, মা আজকে কত শান্ত। আমার শরীরটা ভীষণ
ম্যাজম্যাজ করছে, ভাবলাম একবারে স্নান করে এসেই ব্রেকফাস্ট করবো।
আমি বাথরুমের বালতিতে গরম জল ঢালছি, বাড়ির ল্যান্ডফোনটায় একটা ফোন এল। আমি ছুটে গিয়ে
ধরলাম। মা ডাইনিংয়ে বসে এসব সবই দেখছে। আমার চোখের দিকে একবার তাকালো শুধু, আমরা
কেউই আর কোন কথা বললাম না।
আমার গরম জল ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে আস্তে আস্তে। বাড়িতে তখন লোকে লোকারণ্য। এক্ষুণি
বেরোতে হবে আমাদের।
দুদিন আগে হওয়া হঠাৎ কিডনি ফেলিওরে আমার বাবা….

সবাইকে অবাক করে দিয়ে মা তখন হসপিটাল থেকে ফেরৎ আনা টিফিন বক্সটা খুলে খেতে বসেছে,
এক মুঠ ভাত আর মাছের কয়েকটা কাঁটা। এমন করে খাচ্ছে যেন কতদিন সে কিছু খেতে পায়নি।
আমার ভয় হল, মা এমন করছে কেন,
– ওমা! মা! ওমা! বাবা…
– তোর বাবা রোজ ওই একদলা ভাত ইচ্ছে করে রেখে যেত জানিস,
যাতে শত কাজের মধ্যেও আমার কিছু অন্তত পেটে পড়ে।

Written by: নীলাদ্রি

leave a comment

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial