loader
  • Home   >
  • তুমি আসবে বলেই

তুমি আসবে বলেই

style

তুমি আসবে বলেই

ঋতিকা আজ পুরো ড্রেসিং টেবিলের সামনেটা ছড়িয়ে বসেছে। আজ সে খুব সাজবে। কারণ আজ প্রথমবার অভীক তার ফ্ল্যাটে আসছে। ঋতিকা তাই চায়না কোন কিছুতেই কোনরকম ভুল হোক। সাধারণত সে সাড়ে নয়টার আগে বিছানা ছাড়েনা, কিন্তু আজ সে সাড়ে সাতটার সময় ঘুম থেকে উঠেছে। কাজের মেয়েটাকে ঋতিকা আগে থেকে বলে রেখেছিল সে যান আজ সকাল সকাল আসে। কিন্তু ঋতিকা ঘুম থেকে উঠে দেখলো কমলি তখনও আসেনি। তাই সে উঠে নিজে থেকে ঘরদোর পরিষ্কার করা শুরু করে দিয়েছিল। তারপর কমলি এসে পড়ায় তাকে খানিকটা ঝাড়ও দেয় ঋতিকা। অন্যান্য দিন দেরিতে আসলে ঋতিকা তাকে কিছুই বলে না। কিন্তু আজ স্পেশাল দিন। কমলি আসতেই তার হাতে ঝাড়ুটা দিয়ে ঋতিকা বাথরুমে ঢুকলো। ঠিক একটার সময় অভীকের আসার কথা। তার আগেই সব কিছু রেডি করে ফেলতে হবে। ফ্রেশ হয়ে এসে ঋতিকা রান্না ঘরে ঢুকলো। সে আজ সব নিজের হাতেই রান্না করবে। এর মধ্যে অভীককে একবার ফোনও করা হয়ে গেছে। কমলি প্রথমে সারা ঘর ভালো করে ঝাড়ল তারপর ভালো করে চারিদিক মুছতে শুরু করে দিলো। এটা আজ ঋতিকাই তাকে বলে দিয়েছে। সে বলেছে ঘরে আজ এক কনা ধুলোও যেন না থাকে। কারণ অভিকের ডাস্ট এলার্জি আছে।

#

অভিকের সঙ্গে তার কলেজে দেখা হয়। একটা ছিপছিপে চেহারার ছেলে। লম্বা চুল আর গাল ভর্তি দাড়ি। ঋতিকা যখনই দেখতো, অভীক কলেজে পাঞ্জাবি আর পা জামা পরে আসতো। আর সাথে একটা ঝোলা সাইড ব্যাগ আর চোখে আদ্দি কালের একটা কালো মোটা ফ্রেমের চশমা। ক্লাস করার পর সারাদিন গাছের নিচে একটা খাতা হাতে বসে থাকতো। কারোর সাথে খুব একটা কথা বলতো না।

একদিন অনিন্দিতা ঋতিকাকে এক প্রকার জোর করে তাকে ক্যান্টিনের সামনের ফাঁকা বসার জায়গাটায় ধরে নিয়ে যায়। অনিন্দিতা তাকে বলেছিল “চল কবিতা শুনে আসি”। ঋতিকা সেখানে গিয়ে দেখে কলেজের কিছু ছেলে মেয়ে ভিড় করে অভীককে ঘিরে বসে আছে। সেদিন ঋতিকা অভীকের কবিতা শুনে মুগ্ধ হয়ে যায়। তারপর সে আস্তে আস্তে কবে যে অভীকের প্রেমে পড়ে গেছিলো তা সে নিজেও জানেনা।

#

ঋতিকা বনেদি বাড়ির মেয়ে। কয়েক বছর আগে সে পড়াশোনা করার জন্য শিলিগুড়ি ছেড়ে কলকাতায় চলে আসে। তখন বাবা তাকে এই ফ্ল্যাটটা কিনে দিয়েছিল। তারপর থেকে সে এখানে একাই থাকে। কমলি সকালে এসে তার সব কাজ করে দিয়ে যায়। যেমন বাসন মাজা, ঘর মোছা, কাপড় কাচা, রান্না করা এইসব আরকি।

রান্না শেষ হওয়ার পর কমলিকে আজ সে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে। কারণ আজ সে কোনো রকম ডিস্টারবেন্স চায় না।

#

সাজতে সাজতে ঋতিকা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো সাড়ে বারোটা বেজে গেছে। আবার ঋতিকা ফোনটা তুলে নিলো। সকাল থেকে এখনো পর্যন্ত অভীককে পাঁচবার ফোন করা হয়ে গেছে তার। সে আবার কল করলো। অভীক ফোনটা রিসিভ করতেই ঋতিকা বলল “কতদূর আছো তুমি। আর কতক্ষন লাগবে?”। ওপার থেকে অভীক বললো “এইতো যাদবপুরে এসে গেছি। আর পনেরো মিনিট”। বলে অভীক ফোনটা রাখলো। ঋতিকার মনের ভিতরের আনন্দটা যেন ক্রমশই বাঁধ ভাঙছে। অপেক্ষাটা যেন আর সহ্য হচ্ছে না। সময় যত বাড়ছে, অধীর হয়ে উঠছে সময়ের সাথে। অভীক আর কিছুক্ষনের মধ্যেই চলে আসবে। আজ সে শুধু অভীকের জন্য সাজতে বসেছে, শুধু অভীকের জন্য। ঋতিকা মনে মনে ভাবতে লাগলো, অভীক যখন তাকে এই ভাবে দেখবে তখন অভীকের রিঅ্যাকশনটা কি হবে।

#

ঋতিকা আজ একটা সাদা কুর্তি পরেছে সঙ্গে জিন্স, চোখে কাজল ও হালকা গোলাপি লিপস্টিক। আজ কাজল পরার সময় বারবার হাত কেঁপে ঘেঁটে যাচ্ছিল। ফলে আরও খানিকটা সময় সেখানে দেরি হলো। কাজল পরা শেষ করে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সোয়া একটা বাজে। কিন্তু সোয়া একটা বেজে গেল এখনো অভীক এসে পৌছালোনা কেন। যাদবপুর স্টেশন থেকে তো তার তার ফ্লাটে আসতে মাত্র পনেরো মিনিট লাগে। ঋতিকা টেবিল থেকে আবার ফোনটা তুলে নিলো। সবে অভীকের নাম্বারটা ডায়েল করতে যাবে এমন সময় অভীকের নাম্বার থেকে ফোন এলো। কলটা রিসিভ করেই ঋতিকা অধীর ভাবে বলল “কোথায় আছো? আর কতক্ষন লাগবে তোমায়”? কিন্তু ওপার থেকে একটা ভারী গম্ভীর গলা ভেসে এলো “আপনি কি ঋতিকা দেবী বলছেন?”। ঋতিকা বলল “হ্যা, বলছি। কিন্তু আপনি কে বলছেন”? এবার ওপার থেকে বলল “আমি যাদবপুর থানা থেকে বলছি। এই ফোনটি যার উনি কিছুক্ষণ আগে যখন রাস্তা ক্রস করছিলেন, সেই সময় পিছন থেকে একটা বাস এসে ওনাকে ধাক্কা মারে। আপনি থানায় এসে…………..”। আর কোনো কথাই শুনতে পেলোনা ঋতিকা। মুহূর্তে তার চারিদিকে ক্রমশ অন্ধকার নামতে শুরু করলো। হাত পা যেন অবশ হয়ে গেল। সমস্ত শরীর কাঁপতে শুরু করেছে তার। হঠাৎ ফোনটা হাত থেকে মাটিতে পড়ে গেল।  তারপর…., তারপর আর তার কিছুই মনে নেই।

কলমে : সত্যব্রত

শিল্প : অভিজিৎ

leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial