loader
  • Home   >
  • ভালোবাসি, কখনো বলা হল না বাবা

ভালোবাসি, কখনো বলা হল না বাবা

style

ভালোবাসি, কখনো বলা হল না বাবা

: স্বর্ণালী দত্ত

কি ভাবে লেখা শুরু করবো, জানিনা । এমন অনেক কথা আছে যা কোনোদিন তোমাকে বলাই হয়নি, আসলে এই কথা গুলো যে কোনোদিন মা কে ছাড়া আর কাউকে বলতে হবে, জানতাম না বাবা । ছোটবেলায় স্কুলে বাবা কে চিঠি লিখতে বলতো ।

বাবা জানোতো, কি সব যেন লিখতাম । আজ সেইসব স্মৃতিগুলো ধূসর । আসলে তোমার কাছে আমাকে কোনোদিন কিছু চাইতে হয়নি, মা চোখ দেখে মনের কথা পড়তে জানতো হয়তো, আর তুমি এমনিই যেনে যেতে ।

ঠিক যেন এক ম্যাজিসিয়ান ।

বাবা, ছেলেবেলায় আমি খুব কম কথা বলতাম সবার সাথে, তাই নিয়ে স্কুল ও বাসে আমাকে সবাই বুলি করতো, নানান প্রকার হাসি ঠাট্টা করতো সবাই আমাকে নিয়ে । আমি মুখ ফুটে কিচ্ছুটি বলতে পারতাম না । তারপর একদিন সব ঠিক হয়ে যায় ।

মায়ের কাছে শুনেছিলাম তুমি নাকি প্রিন্সিপাল স্যার ও সেই সব বাচ্চাদের বাবা দের সাথে কথা বলে, যুদ্ধ করে বন্ধ করিয়ে ছিলে । আমি কিচ্ছুটি জানতাম না । তোমাকে কোনোদিন ধন্যবাদ দেওয়া হয়নি বাবা ।

বড় হয়ে ইচ্ছে ছিলো ডাক্তার হবো, ভাগ্যের পরিহাস এ হলাম ইঞ্জিনিয়ার । সমাজ সঙ্গ না দিলেও তুমি চেয়েছিলে আমি ডাক্তার হই, চেয়েছিলে এক বছর ড্রপ করে পরীক্ষায় বসি । আজ একটা সত্যি কথা শিকার করতে কোনো দ্বিধা নেই আমার বাবা, তোমার সাহস থাকলেও আমি চাইনি তোমাকে নিস্স করে দিতে, এক বছর পর যদি না পেতাম?

এই প্রশ্নের কোনো পসিটিভ উত্তর আমি পাইনি, তাই আর রিস্ক নিলাম না বাবা । আসলে এক বছরের খরচা অনেক আর আমাদের আর্থিক অবস্থাটা যে ওতো টা স্বচ্ছল নয় সেটা আমি ছোটবেলা থেকেই জানতাম বাবা ।

জীবনের যৌবন কালে শরীরে বাক এলো ।

একান্নবর্তী পরিবার আমাদের, তাই সবার মধ্যে থাকার অভ্যেস ও কম্প্রোমাইস কিছুটা করতে হয়েছিল আব্বু । খালার লালসা আমাকে গ্রাস করতে শুরু করেছিল ধীরে ধীরে । তুমি যদি সেইদিন মাঝরাতে ছাদের দরজা টা বন্ধ আছে কিনা দেখতে আসলে পুনরায়…..
আমি হয়তো সেইদিনই শেষ হয়ে যেতাম আব্বু । ঠিক করেছিলাম, সেই রাতেই গলায় দড়ি দেব ঐ চিলেকোঠার ঘরে । তুমি আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছিলে, আমিই যে তোমার কলিজার টুকরা আব্বু ।

বাবা, আমার স্বপ্ন টা যে শুধু সাইকেল চালানোয় সীমাবদ্ধ নেই সেটা তুমি বোধয় আমার চেয়েও ভালো জানতে ।

ভারতীয় সেনা বাহিনী তে যে আমারো এক স্থান হতেই পারে সেই স্বপ্নে তুমি আমার কাঁধে হাত রেখে বলেছিলে, ” নিজের স্বপ্নে ডানা মেলে উড়বি তুই ।” শত্রু নামক ভয় কে জয় করতে শিখিয়েছিলে তুমি আমাকে বাবা ।

বাড়ির চার দেওয়াল-ই যে আমার জগৎ হতে পারে না, সেটা তুমিই প্রথম নির্ণয় নিয়েছিলে পাপা ।

“মেয়ে হয়ে জন্মেছে আর তাই ঘরের কাজ কর্ম করবে আর বয়েস হলেই শশুরঘর চলে যাবে ।” না, সমাজের নির্মাণ করা এই ভয়াবহ কারা দন্ড থেকে মুক্ত করেছিলে আমাকে, আমাকে উপহার দিয়েছিলে একটা খোলা আকাশ । সমাজের নিয়ম কে ভেঙ্গে আমিই হয়ে উঠলাম তোমার ছেলে ।

সবাই বলেছে, ” রিক্সওয়ালা নামে সমাজে পরিচয়, তার মেয়ের আবার স্বপ্ন দেখতে আছে নাকি? ”

খুব ভয় পেতাম বাবা ।

মা বলেছিলো, এত কিছুর দরকার নেই । সমাজে বাঁচতে গেলে, সমাজের বেড়াজালেই স্বর্গ খুঁজে নিতে হয় । দাঁতে দাঁত চেপে তুমি এগিয়ে গিয়েছিলে, কারোর কথায় ভয় পাওনি, আর তোমার আঙুলের ভাজের ভিতর ছিল আমার হাত । শক্ত করে ধরে রেখেছিলে ।

আজ আমি সরকারি সংস্থায় উচ্চ পদে কর্মরত । আজ সমস্ত পৃথিবী জানে আমাদের যাত্রার গল্পটা । আমি মনস্থির করেছিলাম বাবা, সাফল্য যেইদিন আমার মাথার মুকুট হবে সেইদিন তোমার রিক্স করেই তোমাকে ঘুরতে নিয়ে যাবো, সবাই কে তোমার গল্প শোনাবো ।

ছেলেবেলায় একবার বলেছিলে, ” আমার মেয়ে নিজের মতন করে জীবন যাপন করবে । ” বড় হয়ে উঠলাম নিজের মতন করেই । তোমার কথা মতন সেলফ ডিপেন্ডেন্ট হলাম আমি, সাফল্য আজ আমার । নিজের মতন করে জীবন যাপন করতে আজ আমি সখ্যম ।

সবার জীবনেই প্রেম আসে, আমার ও এসেছিলো । অনেক স্বপ্ন দেখেছিলাম বাবা । কিন্তু জীবন সব দেয়না । আজ প্রেম দরজা দিয়ে ঢুকে জানালা দিয়ে বেরিয়ে গেছে । একা থাকতে চাই ।

কাল তুমি বললে, ” বিয়ে করতে না চাইলে করবি না । নিজের মতন করে জীবন কে আবিষ্কার করো, আমরা তোমার পাশে আছি ।”

চিঠিটা আজ বন্ধ দরজার মধ্যে দিয়েই লিখছি বাবা, জানিনা এই চিঠিটা আর পাঁচটা চিঠির মতনই তোমার দোরগোড়ায় পৌঁছানোর লড়াইয়ে হেরে যাবে কি না ।

ঘরটা, খুব ছোট এখানে বাবা, শুধু একটা বিশ্রাম নেওয়ার মতন খাট, যদিও তোমাকে ছেড়ে আসার পর থেকে একটা দিন ও শান্তির নিদ্রা চোখে নেমে আসেনি । এখানে সমস্ত টা সময় জুড়ে শুধুই রাত, এখানে পয়সা দিলেই শরীর পাওয়া যায় ।

বাবা, আমি লড়াই করতে পারিনি,তোমার চাওয়ার শর্তে ও আমি লড়াই করতে পারিনি । মা কে নির্মম ভাবে প্রথমে ধর্ষণ ও তারপর হত্যা করেছিল ওরা, তারপর আমাকে নিয়ে পালায় আর আমার ঠিকানা আজ বেশ্যা ঘর ।

তুমি তখন বছর পাঁচেক হয়েছে পঙ্গু হয়ে বিছানা নিয়েছো, সত্যিই আমাদের জীবন দান করার মতন শক্তি তোমার মধ্যে ছিল না ।

আচ্ছা বাবা, তুমি ভালো আছো? তুমি কি আদেও বেঁচে আছো? নাকি এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে নিজের বলে আমার আর সত্যিই কেউ রইলো না?

বাবাদের ছেলে বেলায় ঘোড়া বানিয়ে আনন্দ উপভোগ করা যায় কিন্তু ধন্যবাদটা দেওয়া হয়ে ওঠে না কোনোদিন ।

আজ ও এত কিছু লিখে ফেললাম, কিছু কিছু অজানা বাবা মেয়ের গল্প, বা হয়তো জানা, কিন্তু এত কিছু লিখতে গিয়ে বাবা কে নিয়েই কিছু বলা হলোনা । ও পারলাম না, শুধু এই টুকুই প্রার্থনা করি, “বাবা যেন থাকে দুধে ভাতে ।

আমি, তার মেয়ে হয়ে যেন সেই টুকু দায়িত্ব নিতে পারি । ”

ছবি : প্রিয়ম ঘোষ

leave a comment

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial